আরাকানের মুক্তি আন্দোলন ও একজন কবি বাপ্পা আজিজুল

আরাকানের মুক্তি আন্দোলন ও একজন কবি

বাপ্পা আজিজুল

 

আরাকানের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অনিবার্য নাম কবি বে-নজীর আহমদ (১৯০৩-১৯৮৩)। একজন বিপ্লবী কবি। যেন আরেক নেতাজী। তাঁর কাব্যপ্রতিভা, অসীম সাহসিকতা, নিঃস্বদের প্রতি অনুরাগ ও ইংরেজ রাজশক্তির প্রতি বিরাগ লক্ষ্য করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নাম দেন বে-নজীর আহমদ, যার অর্থ নজীর বিহীন। নজরুলের দেয়া নামের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সে নামেই পরিচিত হন ও কবি খ্যাতি লাভ করেন বে-নজীর আহমদ ওরফে বেনু মিয়া

দ্বিতীয় বিস্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বে-নজীর আহমদ আরাকান যান। সেখানে আরাকানী (রোহিঙ্গা) মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন আরাকান মুসলিম রাজ্য স্থাপনে তৎপর হন। কক্সবাজার কেন্দ্রিক আপদকালিন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছদ্মাবরণে তিনি একাজ করতে থাকেনকিন্তু অচিরেই বৃটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে তাঁর আসল উদ্দেশ্য ধরা পড়ে। ফলে সেখানে মাত্র দেড় বছর অবস্থানের পর তিনি তাঁর কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। তারপর তিনি কলকাতায় ফিরে এসে নজরুল সম্পাদিত ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন।

বেনজীরের সামগ্রিক জীবন পরিক্রমা পর্যালোচনা করলে এ যেন আরেক নজরুল। তিনি যথার্থ নজরুলগামী। যেহেতু নজরুল ইসলামের চঞ্চলতা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত, তাই নজরুলের অনুকরণ খুব বেশী হয়নি। দুজন কবির মধ্যে কিছুটা বিশিষ্টভাবে কাজীর বিদ্রোহ ও চাঞ্চল্য রূপ পেয়েছিল, তাঁদের একজন বে-নজীর আহমদ, অন্যজন কবি মহিউদ্দিন (১৯০৬-১৯৭৫)। বে-নজীর আহমদের জীবনেও যুগের রাজনৈতিক বিক্ষোভের ছাপ আছে। তিনি আজীবন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে বিপ্লবী সূর্যসেনের আত্মঘাতী স্কোয়াডেও ছিলেন। কিন্তু কালীর চরণে রক্তশপথ, বিভিন্ন শিরক ও মুসলিম বিদ্বেষ দেখে তিনি তা ত্যাগ করে আজাদ পার্টি নামে স্বতন্ত্র দল গড়েন। পরবর্তীতে মুসলিমদের মুক্তি আন্দোলন মুসলিম লীগে সক্রিয় ছিলীন। নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য। বিপ্লবী কর্মকান্ড জোরদারে বৃটিশ ভারতে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ইউরোপ যাত্রা করেন যদিও গুরুতর অসুস্থতার দরুন কার্যসিদ্ধি না করে ফিরে আসতে হয় তাঁকে। সাংবাদিক বন্ধু ফজলুল হক সেলবর্ষীকে জার্মানি পাঠান টাকা ছাপানোর কৌশল রপ্ত করতে, তিনিও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। কারাবরণ করেছেন দুবার। দুবারে প্রায় তিনমাস কারাবাসে জেল পালানোর ইতিহাসও আছে তাঁর।

বর্ণাঢ্য জীবন থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত হয় তাঁর লেখালেখির উপজীব্য যুগকে ধারণ করে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ, জাগরণ, স্বাধীনতা ও রাজদ্রোহিতা তাঁর কলমে ফুলকি হয়ে ঝরেছে। তিনি লিখেছেন- “আলোর জিন্দেগী লাগি ভাঙো দ্বার জিন্দানখানার/ হে জিন্দা জোয়ান-/ তোমার মঞ্জিল রোধি জাগিয়াছে যে- বাঁধা বিন্ধার/ করো তারে চূর্ণ খানখান“ (আন্দেশাঃ জিন্দেগী)

‘হেমন্তিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘কাফেলা’ কবিতায় কবি বলছেন- “নূতন দিনের পথে- হে চিরকাফেলা/ যাত্রা তবে হবে পুন শুরু?/ রাতের তিমির-গাঢ় বজ্র-ঘন ক্রুর মেঘ-মেলা/ এখনো যে ডাকে গুরু গুরু।“ জীবদ্দশায় কবির প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি। ‘বৈশাখী’ ও ‘বন্দীর বাঁশী’ দুটি কাব্যগ্রন্থ। প্রবন্ধগ্রন্থ- ‘ইসলাম ও কমিউনিজম’তাঁর মৃত্যুর পর কবিপুত্র মালিক মিনারের উদ্যোগে ‘জিন্দেগী’ ও ‘হেমন্তিকা’ নামে আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নওরোজ, নবযুগ, মাসিক মোহাম্মদী, মাহে নও, দৈনিক আজাদ প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন। স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমী (১৯৬৪), একুশে পদক (১৯৭৯) ও ইসলামী ফাউন্ডেশন পুরস্কার (মরণোত্তর)।

শব্দ ব্যবহারে এবং ধ্বনির সামঞ্জস্য ও অনুসারে বহুলাংশেই তিনি নজরুলের নিকটবর্তী। যেমনটি কবি ও সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন- বে-নজীর আহমদের জীবনের সঙ্গে নজরুল ইসলামের জীবনের অনেকটা মিল আছে। বরঞ্চ বে-নজীর আহমদ জীবনে যতটা দুঃসাহসী, ভয়ংকর ও অস্বাভাবিকত্বের মুখোমুখি যেভাবে হয়েছেন, সেভাবে নজরুল ইসলাম হতে পারেননি। অবশ্য কবি প্রতিভার দিক থেকে বে-নজীর আহমদ নজরুল ইসলামের অনুসারী হিসেবে পরিচিত থাকবেন। তাঁকে অতিক্রম করা বে-নজীরের সম্ভব হয়নি। 

 

No comments

Theme images by A330Pilot. Powered by Blogger.