রমাদানের প্রস্তুতি || বাপ্পা আজিজুল || মানসলোক ||
রমাদানের প্রস্তুতি
বাপ্পা আজিজুল
রমাদানের প্রস্তুতি যেভাবে নেবেন
মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্ববহ মাস রমাদান সমাগত। মহিমান্বিতা মাসটিকে বরণ করে নেয়ার সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। এর মধ্যে দিয়ে অবসান হতে চলছে একবছরের অপেক্ষা। বলা বাহুল্য, রমাদান যেমন ইবাদতের তেমনি উৎসবের। আসুন মাসটি নিয়ে কিছু ভাবনা শেয়ার করা যাক-
১। রমাদান সম্পর্কে সঠিক প্রস্তুতি ও শতভাগ সফল বাস্তবায়নের জন্য রমাদানকে জানুন-
- সূরা বাকারা ১৮৩-১৮৭ (অর্থ ও ব্যাখ্যা)
- কিতাবুস সাওম (বুখারি, মুসলিম কিংবা সিহাহ সিত্তার যেকোনটি বা সবকটি)
- রমাদান সংক্রান্ত একাধিক বই (অন্তত ২০০ পৃষ্ঠা)
২। রমাদানে কুরআনের সাথে যুক্ত থাকুন-
- শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে শিখুন
- বেশি বেশি তিলাওয়াত করুন (দৈনিক অন্তত ৫০ আয়াত)
- অর্থ বুঝে পড়ুন (অর্থসহ খতমের পরিকল্পনা নিতে পারেন)
- ব্যাখ্যাসহ পড়ুন
- বিশেষ সূরা বা আয়াত মুখস্থ করুন
- নোট করুন /গবেষণা করুন
- কুরআন বিতরণ করুন
- কুরআনের আলোকে জীবন গড়ুন
৩। সালাতের ব্যাপারে আন্তরিক হোন-
- ফরয সালাত জামা’আতে পড়ার চেষ্টা করুন
- ফরযের আগে পরে নফলগুলো নিশ্চিত করুন
- নিয়মিত কিয়ামুল লাইলে অভ্যস্ত হোন
- সময় নিয়ে ধীর-স্থিরভাবে আদায় করুন
- সালাত অন্তে বিভিন্ন দু’আ ও যিকিরে সচেষ্ট হোন
৪। রমাদানের বিশেষ অফারগুলো কাজে লাগাতে পারেন-
- কিয়ামুল লাইল (সেহরিতে একটু সময় নিয়ে উঠলেই সম্ভব)
- ই’তিকাফ (এক দিন এক রাতের জন্য হলেও)
- লাইলাতুল ক্বদর (শেষ দশদিনের বেজোড় রাত্রিতে)
৫। রমাদানে সাধ্যমত সদাকা করার চেষ্টা করুন-
- কোন প্রার্থিকে ( ফকির, মিসকিন, ইয়াতিম, বঞ্চিত) ফেরত দেবেন না
- অসচ্ছলদের কর্জে হাসানা দিতে পারেন
- বিরাট আয়োজন ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে সহযোগিতা করুন
- অতিথিকে নিয়ে সেহরি/ইফতার করুন
- যেকোন কল্যাণই সদাকা। এমনকি মুচকি হাসিও। সদাকার অগ্রাধিকার এভাবে- পরিবার > নিকটাত্মীয় > প্রতিবেশী
- ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন সদাকার কর্মসূচি নিতে পারেন। দূর আত্মীয়দের খোঁজ নিতে পারেন। গতানুগতিক ঈদসামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি প্রকৃত প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হোন
- এলাকা ভিত্তিক কল্যাণ কার্যক্রমে অংশ নিন ।
৬। রমাদান ও ঈদে সাংস্কৃতিক জীবনে পরিবর্তন আনুন-
- সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করুন
- অপসংস্কৃতিকে পরিহার করুন
- বিভিন্ন চ্যানেলে রমাদান সংক্রান্ত বা ইসলামি প্রোগ্রামে চোখ রাখুন
- অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত শুনে আপ্লুত হোন
- বিখ্যাত স্কলারদের লেকচার শুনে সমৃদ্ধ হোন
৭। রমাদান ও প্রযুক্তির ব্যবহার
- প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আল্লাহভীতির পরিচয় দিন।
- সময় অপচয়, আনপ্রোডাক্টিভ কাজ থেকে সংযত থাকুন।
- আপনার যোগ্যতা ও সামর্থ্য বিচারে প্রযুক্তির মাধ্যমে দাওয়াহ চালাতে পারেন।
- প্রযুক্তি ব্যবহারে পর্দার বিধান বারবার স্মরণে রাখুন। প্রয়োজনে ফেবুতে ফটো অপশন ওমিট করে রাখতে পারেন।
- প্রযুক্তি বা যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচার, বিদ্বেষ ছড়ানো, তর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
৮। রমাদান ও পরিবার
- পরিবারে যথেষ্ট সময় দিন (কারণ আপনি মুত্তাকি পরিবারের প্রধান)
- সদস্যদের সৎকাজে উৎসাহিত করুন
- সন্তানদের (বিশেষ করে ছোটদের) সাথে নিয়ে সালাতের অভ্যাস করুন
- যাদের উপর সাওম ফরয নয় তাদেরকে সাওমের জন্য সাধ্যের আলোকে উদ্বুদ্ধ করুন। রোযা রাখার জন্য পুরস্কৃত করুন। বৃদ্ধ বাবা- মা না পারলে ফিদইয়া দিন
- পরিবারের ছোটদের সম্মানে তাদের সহপাঠী, বন্ধু, খেলার সাথীদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করতে পারেন। সেখানে কুরআন-হাদিসের গল্প, ইসলামি সঙ্গীত শোনানো যেতে পারে
- একান্নবর্তি পরিবারে সবাই মিলে কুরআন খতম করা যেতে পারে
- রমাদানের শুরুতে ও শেষে চাঁদ দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে । পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছাদে কিম্বা বেলকনিতে আসরের পর থেকে বসা যেতে পারে। সেখানে হালকা ইসলামি সঙ্গীতের আয়োজন থাকবে
- ইফতারের পূর্বে সম্মিলিত দু’আর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবেন না। পনের বিশ মিনিট আগে বসে হালকা দারসের ব্যবস্থা হতে পারে
- পরিবারের মধ্যেই কুরআন মুখস্থের প্রতিযোগিতা হতে পারে
- আপনার সন্তানের দ্বারা আতশবাজি, লাউড স্পিকারে গান, শপিং মলে ইভটিজিং ইত্যাদি অসামাজিক কাজ যেন না ঘটে সতর্ক থাকুন।
৯। রমাদান ও স্বাস্থ্য
- সুস্বাস্থ্য আল্লাহর দেয়া নেয়ামত। তাই স্বাস্থ্যের পরিচর্যা করাও ইবাদতের শামিল।
- সেহরি, ইফতার বা রাতে ভুড়িভোজ থেকে বিরত থাকুন।
- পান, বিড়ি-সিগারেট কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের বদ অভ্যঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার এইতো সময়।
- যারা হার্টের অসুখ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস কিংবা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছেন, তারা রমাদানের পূর্বে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাৎ করে আপনি সাওম পালনের উপযুক্ত কিনা জেনে নেবেন। এছাড়া যারা দিনে তিনবেলা ঔষধ খান কিংবা ইনসুলিন নেন তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময় ও ডোজ পরিবর্তন করে নেবেন। একই পরামর্শ গর্ভবতী নারীদের জন্যও প্রযোজ্য।
এখানে কিছু ধারণা দেয়া হয়েছে মাত্র। স্থান- কাল- পাত্রভেদে তা ভিন্ন হতে পারে। রমাদান হোক আত্মযাচাই ও আত্মশুদ্ধির। রমাদান হোক ইবাদতের। রমাদান হোক ব্যক্তি ও পরিবার গঠনের। সাওম হোক বদলে যাওয়ার হাতিয়ার।
কবি ও চিন্তক,
(লেখক: রমাদান কারীম- দ্য প্যানাসিয়া অব হার্ট)

No comments