যাকাত ও ফিতরা: টুকরো ভাবনা || বাপ্পা আজিজুল || মানসলোক

 


যাকাত ও ফিতরা: টুকরো ভাবনা

বাপ্পা আজিজুল 

সরকারি উদ্যোগে জাতীয় যাকাত বোর্ড গঠন করা হোক। সারাবছর যাকাত উত্তোলন হোক। 

১.

সুদকষার গণিত বাদ দিয়ে পাঠ্যবইয়ে #যাকাত কষার অংক যোগ করা উচিত। তাহলে একটা বেসিক নলেজ সবার শৈশবে ঢুকে যাবে। মিরাস বন্টনের অংকও থাকতে হবে। তাহলে প্রতিবছর এগুলো নিয়ে ক্যাঁচাল লাগবে না। হুজুরদের পেছনে দৌড়াইতে হবে না। একেক হুজুর একেক মাসলাক/মানহাজের ফতোয়া দিয়ে বিভ্রান্ত করে। এব্যাপারে সদকাতুল ফিতরের মতো ইসলামিক ফাউণ্ডেশন এর একটি ন্যাশনাল গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। 

২.

অনেকের জন্য হজম করতে কষ্ট হলেও সত্যি- "রমাদানের সাথে যাকাতের ন্যুনতম ও দূরতম সম্পর্ক নাই"। একান্ত যদি কারও শাওয়াল মাসে ফরজ হয়ে যায়, তিনি বরকতের জন্য রমাদানে অগ্রিম হিসাব করে দিতে পারবেন। আব্বাস রা.এর ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা. এই অনুমতি দিয়ে ছিলেন। তাহলে আপনি চন্দ্রবর্ষে আপনার যাবতীয় আর্থিক বিষয়াদির হিসাব করছেন? উত্তর সম্ভবত না। কারণ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আমরা সৌরবর্ষ অনুযায়ী লেনদেন করি। সৌরবর্ষে যাকাত দিতে কোন অসুবিধা নেই, শুধু ২.৫% এর পরিবর্তে ২.৫৭% দিতে হবে। সারাবছর যাকাত ফরজ হয়, হওয়া মাত্র বিলম্ব না করে যথাযথভাবে আদায় করুন। 

৩. 

ব্যবহার্য সামগ্রীর যেমন যাকাত নেই, ব্যবহার্য সোনারও যাকাত নেই। তবে নিসাবের উপরে গেলে দিতে হবে কিনা মর্মে ৩ টি মত আছে। দেয়া ওয়াজিব, দিতে হবে না, একবার দিলেই হবে। অর্থাৎ কালেভদ্রে পরে এমন যদি কারও ২০-৩০ ভরি সোনা থাকে তিনি উপরের ৩ টির যেকোনোটি আমল করতে পারেন। সোনার নিসাব সোনাই। অন্য সম্পদের ক্ষেত্রে আপনি রূপার নিসাব (১ মার্চ ২০২৬ অনুযায়ী ৩,৩৩০০০/-প্রায়) ধরে আগাইতে পারেন। সম্মিলিত ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফরজ নয়, ব্যক্তিগত ফরজ কিনা হিসেব করে আদায় করুন। ঋণমুক্ত হওয়া জরুরি। গচ্ছিত অর্থ, ডিপিএস, এফডিআর এর টাকা হাতে না এলেও যাকাত দিতে হবে। ইসলামি বিমা/জীবনবিমা ম্যাচিউরড হলে তখন সেটির উপর যাকাত দিতে হবে। 

৪.

একটি হিসাব মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৭১০০০ কোটি টাকা যাকাত উত্তোলিত হয়েছে (Fintech, 2024)। এই অংক আরও কয়েকগুণ বাড়বে। সরকারিভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদলে জাতীয় যাকাত বোর্ড গঠন করা হোক। যাকাত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হোক। প্রথমে ৫-১০ বছর স্বেচ্ছামূলক চর্চা করে একপর্যায়ে জাতীয়ভাবে যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক করা হোক। যেমন- মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান। ন্যাশনাল আইডি ও জন্মতারিখ নিবন্ধনের মাধ্যমে যাকাত দাতা ও গ্রহীতার ডাটাবেজ তৈরি করা হোক। গ্রহীতার একাউন্টে স্বয়ংক্রিয় যাকাতের টাকা ঢুকে যাক। যাতে যাকাত খাওয়ার দায়ে গ্রহীতাকে হীনমন্য হতে না হয়। যারা বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে  যাকাত তোলেন, সারা বছর তুলুন। পেইড যাকাত সম্পাদক নিযুক্ত করুন। তার কাজই হবে যাকাত ব্যবস্থাপনা ও খাতভিত্তিক ব্যয় নিশ্চিত করা। জনসম্মুখে হিসাব উন্মুক্ত রাখুন। কাউকে পুরোপুরি ঋণমুক্ত করা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাকে গুরুত্ব দিন। অসহায়দের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা যাবে যাকাতের টাকা দিয়ে৷ আল্লাহর ওয়াস্তে শাড়ি, লুঙ্গি দেবেন না।

৫. 

যাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় দুধরণের মানুষ থাকবে। একদল যাকাত দেবে, অন্যদল গ্রহণ করবে। আপনি দিতে সমর্থ নন মানে মিসকিন, ঋণগ্রস্থ কোন না কোন ক্যাটাগরিতে যাকাতগ্রহীতা হিসেবে গণ্য হবেন। দেবেন না আবার খাবেন না, তা হবে না, তা হবে না।

৬.

যাকাত ফেস্ট বা মেলা

আয়কর মেলার ন্যায় যাকাত মেলা বিভিন্ন জেলা/মহানগরগুলোতে আয়োজন করা যেতে পারে। স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল ভাড়া করে ১ বা ২ দিন ব্যাপী এধরণের মেলা জেলাশহর/মহানগরে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে। 

* কমপক্ষে ৮-১০টি স্টলের ব্যবস্থা করা। 

* স্টলে ঘুরলে যাকাত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকাশনা, বই, ব্যাগ, টিশার্ট ইত্যাদি উপহার দানের ব্যবস্থা করা। আবার ক্রয়ের সুযোগ রাখা।  

* যাকাত কনসালটেশন ও হিসাবের সুযোগ

* যাকাত নিয়ে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি, প্রেজেন্টেশন, আলোচনা রাখা

* যাকাতের এপ্লাইড দিক তুলে ধরা। দেশে দেশে যাকাত উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে ধারণা দেয়া। 

* ইসলামি স্কলারদের সাথে মিট করানো, প্রশ্নোত্তর 

* যাকাত কালেকশন বুথ রাখা


টার্গেট পিপল: সকল পটেনশিয়াল যাকাতদাতা (মুজাক্কি)

দাওয়াত: সরকারি বিভিন্ন অফিস, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ীসহ সকল পেশাজীবীদের।

যাকাতের হিসাব করুন অনলাইনে: https://assunnahfoundation.org/zakat-calculator

সাদকাতুল ফিতর নিয়ে শুভবুদ্ধির উদয় হোক

আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। চাউল দিয়েই ফিতরা দেব। যে যে রকমের চাউল খাই। বাজার দর অনুসারে। আমার ফিতরা দেব। ২৮ রোযা থেকে দেব। আগে দিলে গ্রহণকারী ঈদকেন্দ্রিক ব্যয় না করে অন্যকাজে ব্যয় করলে ফিতরার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। 

১. চাউল থেকে ফিতরা বের করতে সমস্যা কোথায়?

রহমতপূর্ণ রমাদান শেষ হতে চলল। সামনেই মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। সে উপলক্ষেই ইসলামের একটি বিধান সাদাকাতুল ফিতর বা যাকাতুল ফিতর। যা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার উপর ফরজ। এ সংক্রান্ত ইবনে উমার, ইবনে আব্বাস প্রমুখ সাহাবির সহিহ বর্ণনা আমরা পাই। 

সহিহাইনে আবু সাঈদ খুদরির যে হাদিসটি বলছে আমরা রাসুলুল্লাহর সা. যুগে এক সা ত'আম বা খাদ্য বের করতাম। আর আমাদের সেসময় ত'আম ছিল যব, খেজুর, কিসমিস ও পনির।  এছাড়া কোন কোন রেওয়ায়েতে গম, আটা, ছাতুরর বর্ণনা এসেছে। আবু দাঊদ র. বলেছেন, এই বর্ণনাগুলোর অন্যতম রাবি সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ভুলে আটার নাম যুক্ত করেছেন। এছাড়া ইবনে খুযাইমা ইবনে আব্বাসের আটার হাদিস বর্ণনা করেছেন। আবু হাতিম র. উক্ত বর্ণনাকে মুনকার ও সনদ বিচ্ছিন্ন বলেছেন।  

আবু সাঈদ খুদরি রা. বর্ণিত সহিহ হাদিসের আক্ষরিক অর্থ হিসেবে সালাফি স্কলারেরা মনে করেন উল্লিখিত ৪ টি খাদ্য (যব, খেজুর, কিসমিস ও পনির) ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে ফিতরা আদায় জায়েজ হবে না। কিন্তু হাদিসে উল্লিখিত ত'আম শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। ত'আম হল তাই যা খেয়ে মানুষ জীবন ধারণ করে বা স্থান-কাল-পাত্রভেদে যা মানুষের প্রধান খাদ্য। অতএব, যে দেশে যা প্রধান খাদ্য তা দিয়ে ফিতরা আদায় জায়েজ।

আল্লামা শাওক্বনী মনে করেন, "ফিতরা স্থানীয় সাধারণ আহার্য হতে এক সা বের করতে হবে"। ইমাম মালিকের মতে, যে শহরের লোকের যা প্রধান খাদ্য তাই দিয়ে ফিতরা  প্রদান করবে।ইমাম শাফেয়ী বলেন, দানা (হাব্বা) দ্বারাই ফিতরা আদায় করা উচিত। ইমাম আহমাদ বলতেন, সকল প্রকার দানা ও ফল দ্বারা ফিতরা দেয়া জায়েজ। 

চার মাযহাবের ইমামই মনে করতেন, চীনা, বাজরা, চাল ও খোসাহীন যব জাতীয় সকল খাদ্য দ্বারাই ফিতরা দেয়া যাবে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। আর তার 'র ম্যাটেরিয়ালস' চাল। যা একটি দানাদার খাদ্যশস্য। সুতরাং চাল থেকে ফিতরা বের করা যেতেই পারে এবং তাই যুক্তিযুক্ত।

গম ব্যতীত সব খাদ্যের ক্ষেত্রে এক সা পরিমাণ ফিতরা ধার্য। মুয়াবিয়া রা. এর আমলে সিরিয়ায় পণ্যের দাম বেশি থাকায় অন্যান্য অঞ্চল  ও খাদ্যদ্রব্যের সাথে মূল্যের সামঞ্জস্য রাখার জন্য অর্ধ সা গমের পরিমাপ চালু হয়। সেটি এখনো বলবৎ আছে। তবে এক সা গমের ক্ষেত্রেও স্কলারদের শক্ত অভিমত আছে। 

বর্তমানে এক সা সমান ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ভর ধরা হয়। এটি আবার যুগে যুগে স্থানভেদে বিভিন্ন রকম ছিল। মদিনা, সিরিয়া, কুফা, বসরার মাপ অনুসারে তারতম্য দেখা যায়। ইমাম আবু হানিফা এক সা সমান আট রতল বা বাংলা মাপ অনুসারে ৪ সের নির্ধারণ করেন। কেজি হিসেবে তা ৩.৭২ কেজি। তাহলে ৬০/- কেজি হিসেবে কেউ চাল খেলে তার ফিতরা আসবে ২২৩/-। 

আমাদের মতে চালের হিসেবে ৩.৭২ কেজি ফিতরা আদায় করা যুক্তিযুক্ত। যার যার আর্থসামাজিক অবস্থা অনুসারে যে দামের চাল খায়, সে দামে ফিতরা আদায় করবে। যদিও রাসুলুল্লাহর সময়ে খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমেই ফিতরা আদায় করা হত। তখন সমমূল্য প্রদানের রেওয়াজ চালু হয়নি। তবে এখনকার যুগচাহিদা, বাজার ব্যবস্থা অনেক কমপ্লেক্স হওয়ায় এভাবে সরলীকরণ করা সম্ভব নয়। তাই আপনি উভয় আমলই করতে পারেন। খাদ্যদ্রব্য কিংবা সম পরিমাণ অর্থ। বরং অর্থ দিলে দরিদ্র মানুষটি তার প্রয়োজনের যেকোন দ্রব্যই ক্রয় করতে পারবে। কারণ প্রয়োজন পূরণই তাদের ফিতরা দেয়ার মূল স্পিরিট।

২. টাকা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েজ বলেই সারাবিশ্বে এমনকি বাংলাদেশে ইফা ন্যুনতম একটি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। যেই শায়েখরা মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া ফিতরা দেয়া যাবে না, তারা বর্তমান বাজার ব্যবস্থা, মুদ্রা ব্যবস্থা এমনকি ইসলামি ব্যাংকিংকেও অস্বীকার করেন। নাজায়েজ মনে করেন।

৩. ইফার বেঁধে দেয়া ন্যুনতম ১১০/- এটা গমের হিসাব। রিভিউ করা যেতে পারে। যারা ডায়াবেটিক রোগী ২ বেলা রুটি খায় তাদের জন্য ঠিক আছে। যারা ৭-৮ ধরণের বাদাম/মিক্সড ফ্রুটস ঘিয়ে ভেজে কিটো ডায়েট করেন তারা সেই হিসাবে ফিতরা দেবেন। 

ফিতরা ও জায়েদের গল্প

শুধু খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দিলে বর্তমান সময়ের মানুষের ফাঁকিবাজি মানসিকতা ও সিন্ডিকেটের কারণে বাজার অনিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে৷ অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণ ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এবং ইসলাম এই ব্যাপারে কঠোর। রাসুল সা. ও খলিফারা নিয়মিত বাজারে অভিযান চালাতেন। বাজারের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই আমির মুয়াবিয়া রা. গমের দিয়ে ফিতরা 'অর্ধ সা' করেছিলেন। এটি তাঁর ইজতিহাদ ছিল। ভুল হলেও তিনি ইজতিহাদের সওয়াব পাবেন। 

এবার আসুন যে বাংলাদেশী শায়েখেরা বলছেন যব, কিসমিস, খেজুর ও পনির এই চার খাদ্যদ্রব্য ছাড়া ফিতরা আদায় হবে না এবং সেগুলোই দিতে হবে, সমমূল্য দেয়া যাবে না তারা ইজতিহাদকে অস্বীকার করছেন। সমসাময়িক যুগ জিজ্ঞাসাকে ইগনোর করছেন৷ এটি হয় তাদের অজ্ঞতা কিংবা সংকীর্ণতা অথবা জ্ঞানপাপ জাতীয় কিছু কিংবা ভিন্ন কোন এজেন্ডা৷ 

খোঁজ নিয়ে দেখুন সেই শায়েখেরা কিংবা তাদের কমিউনিটির লোকজন (ফিরকাও বলতে পারেন) প্রধানখাদ্য হিসেবে উল্লিখিত ৪টি খাদ্য নিয়মিত খান না। কেননা এগুলো ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল। আমদানি নির্ভর। 

বিতর্কের খাতিরে ধরে নিলাম- এই বছর এই চারটি খাদ্যদ্রব্য দিয়ে বাংলাদেশের ফিতরা ওয়াজিব হওয়া সকল মানুষ ফিতরা আদায় করবে। ধরে নিলাম ৩০% মানুষ দরিদ্র। তারা ফিতরা খাবে। বাকি ৭০% মানুষ বা ১৩ কোটি মানুষ ৩.৩ কেজি করে উক্ত ৪টির মধ্যে থেকে যেকোনো একটি দ্রব্য ফিতরা দেবেন। এখন হিসাব করেন কত লাখ মেট্রিক টন খেজুর, কিসমিস, যব ও পনির আমদানি করতে হবে? সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সুযোগটি লুফে নেবে। রমাদান আসলেই পিয়াঁজ, আলু, চিনি, তেলের মতো ঐ চারটির দামও ঘোড়ার চেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাবে। আবার বাজারে যাকাতের শাড়ি, লুঙ্গির মতো ফিতরার খেজুর, যব নামে লো কোয়ালিটির পণ্য বিক্রি শুরু হয়ে যাবে।

এবার ধরুন জায়েদ নামে একজন অসচ্ছল ব্যক্তির পরিবারে ৫ জন সদস্য। তারা ৫ জনই ফিতরা সংগ্রহের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত ২ মণ যব (যেহেতু যবের দাম কম), ১ মণ খেজুর, ২০ কেজি কিসমিস ও ১০ কেজি পনির সংগ্রহ করল। যেহেতু এগুলো কোনটাই তাদের প্রধান খাদ্য নয় তাই শখের বসে ১০ কেজি যব (ঈদের পরে আটা বানিয়ে মাঝেমধ্যে রুটি, বিভিন্ন নাস্তার আইটেম ও পিঠা তৈরি করে খাবে), ৫ কেজি খেজুর, ১ কেজি কিসমিস (সেমাই, পায়েশ, ক্ষীর ও পোলাও এর জন্য), ১/২ কেজি পনির রেখে দিল। কাল ঈদ। ঘরে ঘরে আনন্দ। কিন্তু জায়েদের হাতে নগদ অর্থ নেই। তাকে এখন ফিতরা পাওয়া খাদ্যদ্রব্য নিয়ে বাজারে ছুটতে হবে। এগুলো বিক্রি করে ক্যাশ দিয়ে সেমাই, চিনি, খাবারের চাল, পোলাও চাল, গরুর গোশত, সোনালী মুরগি, ইলিশ মাছ, কাঁচাবাজার, সবার জন্য নতুন কাপড়, জুতা কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। এছাড়া কিছু টাকা রেখে দিতে হবে ঈদের পরে সংসার চালানোর জন্য। করোনা, লকডাউনে তার কোন কাজকর্ম নেই। 

জায়েদ বাজারে যব, খেজুর, কিসমিস ও পনির নিয়ে বসে আছে। তার মতো ফিতরা সংগ্রহকারী আরও অনেক লোক বসে আছে। ক্রেতা নাই। কারণ যারা ফিতরা দিয়েছে তাদের প্রধানখাদ্য এগুলো নয়। তারা ঈদ উপলক্ষে এগুলো কেন কিনবে? তবুও কেউ কেউ খেজুর, কিসমিস, পনির কিনতে আসছে৷ জায়েদের কাছে যেগুলো আছে এগুলো লো কোয়ালিটির। তাই কেউ নেয়ার উৎসাহ পাচ্ছে না। যেও নিতে চায় দাম বাজারে বিক্রয়মূল্য  এর চেয়ে অনেকে কম বলছে। কেননা এরকম ভুরিভুরি মানুষ দ্রব্য নিয়ে বসে আছে। জায়েদের মতো অন্যরাও ক্রেতা কম হওয়ায় সস্তা দামে বিক্রির প্রতিযোগিতা করছে৷ যেহেতু কিনতে হয়নি তাই যা পাওয়া যায় তাই লাভ। (একই সমস্যা কুরবানী ঈদেও হয়। সন্ধ্যায় মোড়ে মোড়ে ফকিরেরা ৩০০ টাকা কেজি গোশত বিক্রি করে ক্যাশ নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফেরে।) 

তো জায়েদ বাধ্য হয়ে অর্ধেক দামে অল্পকিছু যব, খেজুর, কিসমিস, পনির বিক্রি করে আশানুরূপ ক্যাশ না পেয়ে বাসায় দ্রব্যগুলো রেখে মার্কেটে ঈদের কেনাকাটা করতে গেল। এদিকে চাঁনরাতে শেষমুহূর্তে সকল পণ্যের আকাশ্চুম্বী দাম। শুধু তার বিক্রি করা দ্রব্যের দাম ছিল না। তার গচ্ছিত খাদ্যদ্রব্যগুলো যদি আগামীবার রোযার সময় পর্যন্ত রাখা যেত তাহলে বড়লোকদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করা যেত। কিন্তু এগুলো ব্যক্তি উদ্যোগে এতদিন মান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যাবে না৷ সুযোগটি নেবে মুনাফাখোর মজুতদারেরা। তারা ঈদের পরে নামমাত্র মূল্যে মহল্লায় মহল্লায় ট্রাক নিয়ে গিয়ে ঐ চারটি খাদ্যদ্রব্য কেনা শুরু করবে। সারাবছর গুদামে ফেলে রেখে আগামী বছর রমজানে আবার চড়া দামে বিক্রি করবে৷ আচ্ছা, সরকার চাইলে টিসিবির মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে। সেক্ষেত্রে সদিচ্ছা থাকতে হবে। কিন্তু ফিতরা সংগ্রহের সময় খুব ন্যারো। ২৮ রমাদান থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত। এর মধ্যে সরকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে না৷ ফলে ঈদে প্রয়োজনের সময় জায়েদ বা তার মতো ফিতরা সংগ্রহকারী অসচ্ছল ব্যক্তি বা পরিবার সুফল পাবে না। তাহলে ফিতরা আদায়ের উদ্দেশ্য ব্যাহত হল। প্রশ্ন হলোঃ ফিতরা আদায়কারী উচ্চমূল্যে ক্রয় করে দ্রব্যগুলো গরিব লোকদের দিল। গরিব লোকেরা নামমাত্র মূল্যে সেগুলো বিক্রয় করে ঈদের খরচ চালালো (আল্টিমেটলি খাদ্যদ্রব্য টাকাতে কনভার্ট হলো), এতে কে বা কারা আঙুল ফুলে বটগাছ হলো? এখন শুধু চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে যান, সেইম দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়তে হবে। ফিতরার চাল নামে বাজারে আলাদা ব্র‍্যান্ড তৈরি হবে৷ যেগুলো আপনিও খাওয়ার জন্য কিনতে চাইবেন না। প্রেস্টিজিয়াস ইস্যু। অমুক ফিতরার চাল কিনে খায়।

No comments

Theme images by A330Pilot. Powered by Blogger.