আল-আত্তাসের মৃত্যুতে || বাপ্পা আজিজুল || মানসলোক

 

 

আল-আত্তাসের মৃত্যুতে

বাপ্পা আজিজুল 

বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও শিক্ষার ইসলামিকরণের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, মালয়েশিয়ান স্কলার ও চিন্তক সাইয়েদ মুহাম্মদ নাকিব আল আত্তাস আর নেই। আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসামান্য কাজ ও অবদানকে কবুল করুন। আমিন। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে তাঁর তত্ত্বের অনুসারী বৃদ্ধি করুন। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রচুর শিক্ষার্থী-শিক্ষক মালয়েশিয়া যান। কিন্তু তাদের কেউই ফিরে এসে আত্তাসের পরম্পরায় কাজ করেন না। জ্ঞানের ইসলামিকরণের মডেল অনুসরণ করে কেউ বাংলাদেশে কাজে আগ্রহী নন। অথবা উন্নয়নের বা সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় ইসলামিকরণের মালয় মডেল নিয়ে কেউ কোন আন্দোলন-সংগ্রাম দূরে থাক, লেখাজোঁকা বা উচ্চবাচ্যও করেন না। কিন্তু কেন? এইটা উত্তর আমাদের আর্থ সামাজিক বাস্তবতার অনেক গভীরে প্রোথিত। আমাদের আত্তাস নেই, কিন্তু একই পর্যায়ের আরেকজন চিন্তক, ইসলামি স্কলার ড. সৈয়দ আলী আশরাফ ছিলেন। তিনি ইসলামিকরণের মডেল হিসেবে 'দারুল ইহসান' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানও নানাবিধ কারণে দূর্বল, ভঙ্গুর। তাঁর অনুসারীরা নানা বর্গে বিভক্ত। অথচ, ফ্যাসিবাদ উত্তর সময়ে মুসলিম রেনেসাঁ তৈরিতে আমাদের জ্ঞানসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি সেক্টরে ক্রমশ ইসলামিকরণের পথে হাঁটতে হবে। 


জ্ঞানের ইসলামিকরণ নিয়ে আমার একটি লেখা থেকে কিঞ্চিত কোট করছি, "বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও শিক্ষার ইসলামিকরণে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন ড. সৈয়দ আলী আশরাফ, ড. ইসমাইল রাজী, সৈয়দ হুসেন নাসের, সাইয়েদ মুহাম্মদ নকিব আল আত্তাস। ড. সৈয়দ আলী আশরাফের উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে মক্কায় ১ম 'বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয় এবং ফলো আপ হিসেবে পরবর্তীতে আরও ৫ টি (মোট ৬টি) বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (১৯৯৬ পর্যন্ত)। জ্ঞান একটি এবস্ট্র‍্যাক্ট বিষয়  সেটির সেক্যুলারাইজেশন বা ইসলাইমাইজেশন করা যায় না। তবে জ্ঞান আরোহণের মাধ্যম ও পদ্ধতি (অর্থাৎ শিক্ষা) ইসলাইমাইজেশন করা জরুরি। কেননা কলোনি ও মডার্নিজম শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বি-ইসলামিকরণ করেছে, সুতরাং ইসলামিকরণের মাধ্যমেই আমাদের উত্তর আধুনিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক যাত্রা শুরু এবং সফল হতে পারে। ড. আশরাফ মনে করেন, সর্বপ্রকার জ্ঞান বা শিক্ষার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ,  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আমরা যা বিতরণ করি তার ভিত্তিমূলে মানব প্রকৃতি সম্বন্ধে এবং জ্ঞান আহরণ সম্পর্কে ইসলামী ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করাই সত্যিকার শিক্ষার ইসলামীকরণ করা। ড. ইসমাঈল আর-রাজী মনে করেন, পাশ্চাত্য শিক্ষার সবকিছু অবক্ষয়ী নয়। জ্ঞানের ইসলামিকরণে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে ইসলামী জ্ঞান, দর্শন ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে। তিনি এলক্ষ্যে International Institute of Islamic thought (IIIT) গঠন করেন। যার বাংলাদেশ চ্যাপ্টার BIIT নামে পরিচিত। আল-আত্তাস শিক্ষার সমার্থক হিসেবে আরবি তা'দিব ও আদব শব্দের ওপর জোর দেন। তিনি পাশ্চাত্য জ্ঞানের সাথে সমন্বয় নয়, বরং ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থাকে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও দর্শনে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী। এলক্ষ্যে তিনি কুয়ালালামপুরে International Institute of Islamic Thought and Civilization (ISTAC) প্রতিষ্ঠিত করেন"। বিস্তারিত পড়ুন- https://www.manoslok.com/2024/09/blog-post_13.html


আমার একটি অপ্রকাশিত লেখা থেকে সংক্ষেপে মালয় মডেল বলে দেই- ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াতে একসাথে ইসলামি ব্যাংকিং শুরু হয়। ১৯৮৪ তে মালয়েশিয়ার হেলথ সেক্টরকে ইসলামাইজেশন করার উদ্যোগে একটি কমিশন গঠন করা হয়। তারা প্রথম স্টেপে তাদের হাসপাতালগুলোকে ইবাদাহ ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল হিসেবে তৈরির ঘোষণা দেয়। ২য় পর্যায়ে শরিয়াহ বেইজড হাসপাতাল তৈরি করে। নব্বইয়ের দশকে তারা সাধারণ আদালতের পাশাপাশি শরিয়াহ আদালত চালু করে অপশনাল হিসেবে। যার ইচ্ছা সাধারণ আদালতে যাবে, যার ইচ্ছা শরিয়াহ আদালতে যাবে। মালয়েশিয়া তাদের পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলো ইসলামাইজড করে ফেলেছে। প্রাইভেট ও পাবলিক হাসপাতাল শরিয়াহ বেইজড করে ফেলেছে। ইসলামি ব্যাংকিং আছে। যাকাত সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রচুর ধর্মীয় বই মালয়ে অনুবাদ হয়। তাদের এই ইসলামি প্র‍্যাক্টিসগুলো আবার বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে প্রকাশিত। তাই কেউ ধর্মান্ধতা বলে উড়িয়ে দিতে পারে না, মৌলবাদ গালি বা ওয়ার অন টেরর বা স্যাংশন দিয়ে আটকায় না। অথচ, সত্তরের দশকে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়ার প্রেক্ষাপট প্রায় একই ছিল। আমাদের অনেকের ধারণা মালয়েশিয়াতে আনোয়ার ইব্রাহিম এসে ইসলামি মূল্যবোধ চালু করবেন। প্রকৃত ব্যাপার হল, মালয়েশিয়া গত চার দশকে >৯০% ইসলামাইজড হয়ে গেছে। এসব সম্ভব হয়েছে মালয় জাতীয়তাবাদের কারণে, UMNO পার্টি ও PAS পার্টির সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রতিযোগিতার কারণে। বাংলাদেশেও আমরা এখন এমনটি আশা করতে পারি। বাংলাদেশে ইসলামপন্থার যে উত্থান, সেটিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতের রসায়নে ক্রমশ ইসলামিকরণের জারিত হতে পারে শাহজালাল-শাহ মখদুমের আবাদ করা এই পূণ্যভূমি। 


   

No comments

Theme images by A330Pilot. Powered by Blogger.