কৃত্রিম জ্বালানি সংকট: টেকসই সমাধান || বাপ্পা আজিজুল || মানসলোক

 


কৃত্রিম জ্বালানি সংকট: টেকসই সমাধান

বাপ্পা আজিজুল


প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট যেকোনো বিপর্যয় (যেমন- যুদ্ধবিগ্রহ) আমাদের এই সভ্যতার সীমাবদ্ধতা ও ঠুনকো অহমকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমাদের আধুনিকতা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, পশ জীবন-যাপন অনেকটাই কৃত্রিম জ্বালানি, এনার্জি, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ নির্ভর। ২/৪ দিন তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়লে আমরা বেকার হয়ে পড়ব। শহুরে জীবন স্থবির হয়ে পড়বে। সুপেয় পানির অভাব দেখা দিবে। আমাদের বিকল্প শক্তির উৎস তৈরি, ব্যবহার কিংবা অভ্যস্ত হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। বেগ পেতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। উন্নয়ন ব্যাহত হবে। মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে। দেশজুড়ে নেমে আসবে অরাজকতা। নৈরাজ্য। কেবল এনার্জি মজুদ করাই কি সমাধান? কিংবা কর্মঘন্টা কমিয়ে ব্যয় সংকোচন? না। এই সমস্যা যেমন বহুমুখী। সমাধানও বহুমুখী। অনেক গভীর থেকে দীর্ঘমেয়াদে করতে হবে। তেমনই কিছু চিন্তা আমরা শেয়ার করতে চাই-


১. 

জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে হবে

প্রাকৃতিক গ্যাস/পেট্রলিয়ামকে আমরা বিভিন্ন পারপাসে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছি। কখনও সরাসরি, কখনও অন্য শক্তি, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি উৎপাদনে। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। আমদানি করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে কয়লা, গ্যাসও ব্যবহার করতে হয়। অথচ শিল্পক্ষেত্র ব্যতীত গৃহস্থালি ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যুতের চাহিদার সিংহভাগ কেবল সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মিটানো সম্ভব। প্রতিটি বাড়ির চালে/ছাদে একটি সোলার প্যানেল লাগিয়ে স্বনির্ভর করা যেতে পারে। অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে ধার দেয়া সম্ভব এবং আবার নিজের ঘাটতিতে সেগুলো ফেরত নেয়া সম্ভব। 


চার্জার ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা আমাদের একটি ব্ল্যাক হোল। একটি গাড়ির বিপরীতে ২-৩টি ব্যাটারি ব্যাকাপ থাকে। ফলে দৈনিক কতো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যাটারি চার্জে চলে যাচ্ছে সেটির হিসাব, চাহিদা-যোগানের অনুপাত বের করা সম্ভব না। কারণ অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে অন্তত ১০গুন বেশি ভিকেল রাস্তায় চলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিএনজি চলে। শহরগুলোতে টাউন সার্ভিস বাস (৫০/৬০সিট বিশিষ্ট) চালু করলে জ্বালানি নির্ভর ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমবে। গণপরিবহণের সেবার মান উন্নীত করে ব্যক্তিগত বাহনে নিরুৎসাহিত করতে হবে। সিএনজি, অটো ইত্যাদি বাহনের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতে হবে।


জ্বালানি ও শক্তি নির্ভরতা কমাতে ছোট ছোট অভ্যাস বদলাতে হবে। নিকট দূরত্বে শ্রী চরণে ভরসা করতে হবে। অথবা দ্বিচলকে। ৪/৫ তলা উচ্চতায় লিফট নয়। অনলাইন নির্ভরতা কমিয়ে অফলাইনে, স্বশরীরে বিভিন্ন কাজ করতে হবে। অপচয় রোধ করতে হবে। বিশেষ করে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস। অপচয়ের বদ অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে হবে। কেবল বাসা-বাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ইউটিলিটি মেরামতের অভাবে লিকেজজনিত অনেক পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ অপচয় হয়। অবহেলা-অসচেতনতা তো আছেই। বিপণি-বিতানে অযথা আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। রাত ১০টার পরে জরুরি সেবা ব্যতীত সকল দোকান, মার্কেট, প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে। গভীর রাত ধরে ওয়াজ-মাহফিল, মেলা, কনসার্ট-আসর,রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। 


সুপেয় ও ব্যবহার্য পানির ক্ষেত্রে ভূ-গর্ভস্থ উৎসের চেয়ে উপরিভাগের পানির দিকে নজর দিতে হবে। ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়, খনন, দখল ও ডাম্পিং রোধ করে নদী-নালা,খালবিলকে জীবিত করতে হবে। সাগর-নদীর পানিকে রিফাইন করে পানির অভাব পূরণ করতে হবে। বৃষ্টির পানিকে ধরে রাখার কার্যকর কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। 


বিনোদনের জন্য স্ক্রিন নির্ভরতা কমাতে হবে। ইন্ডোর নয় আউটডোর ও কায়িক শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত বিনোদনকে প্রাধান্য দিতে হবে। এতে জ্বালানি ও শক্তিব্যয় কমবে। শরীর ও মন সুস্থ থাকবে। এনার্জি নির্ভর বিলাসদ্রব্য ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। 


২. 

কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে

কর্মক্ষেত্রে কর্মঘন্টা এগিয়ে নিতে হবে। ফজরের পর একটু যৌক্তিক সময় রেখে অফিস শুরু করতে হবে। গ্রীষ্মকালে ৭টা করা যেতে পারে। ড্রেসকোডে শিথিলতা আনতে হবে। গ্রীষ্মকালে আরামদায়ক কাপড়কে (পুরুষদের জন্য ফতুয়া, পাতুয়া, হাফ স্লিভ-শার্ট, চপ্পল) উৎসাহিত করতে হবে। অফিসে ইলেক্ট্রিসিটি, এসি, ইলেক্ট্রনিক ও ইলেক্ট্রিক সরঞ্জাম, যন্ত্র ব্যবহারে ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করতে হবে। 


৩. 

পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা

গত ২ দশক ধরে প্রাকৃতিক পরিবেশ চরম আচরণ করছে।  ফলে গরমে তীব্র গরম, শীতে তীব্র শীত। পরিবেশবান্ধব এনার্জি ব্যবহার করতে হবে। দূষণ রোধ করতে হবে। প্রচুর বনায়ন, ছাদকৃষির প্রচলন করতে হবে। আঙিনা ও ছাদকৃষির মাধ্যমে সবজি ও ফলের চাহিদা মিটানোর চেষ্টা করতে হবে। 


৪.

ধর্মীয় দর্শনকে কাজে লাগানো

ধর্মীয় বিধি, জ্ঞান ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক, গণমানুষকে সচেতন করা। উদ্বুদ্ধ করা। কোন ধর্ম অপচয়ের কথা বলে না। ধর্ম পরোপকারের কথা বলে। ব্যাবসায়ে সততার কথা বলে। মানুষের বিপদ কিংবা সংকটকে পুঁজি করে অতিমুনাফা, ফটকাবাজি, চোরাকারবারি, সিন্ডিকেট সমর্থন করে না। ইসলাম ধর্মমতে, সকল সম্পদের মালিক আল্লাহ তায়ালা। মানুষ কেবল সেসবের আমানতদার। তাই পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্ক রক্ষণাবেক্ষণের। আল্লাহ তায়ালা রব হিসেবে বাতাস, পানি, মাটি, ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ প্রভৃতি বিনামূল্যে দিয়েছেন। এগুলোর সঠিক ব্যবহার ও শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। অপচয় কিংবা আমানতের খেয়ানত করলে আছে জবাবদিহিতা ও শাস্তি। 

 


৫. 

জাতীয়ভাবে প্রোডাক্টিভিটির জন্য আউয়াল (১ম) ওয়াক্তে নামায পড়া জরুরি। মুসলিমদের ডেইলি রুটিন তো হবে নামায কেন্দ্রিক। 


একটু প্র‍্যাকটিস করে দেখুন- ফজরের নামায ৪-৪.৩০ এর মধ্যে, জোহর ১২-১২.৩০ এর মধ্যে, আসর ৪-৪.৩০ এর মধ্যে, মাগরিব যথাসময়ে, এশা ৭.৪৫-৮.১৫ এর মধ্যে। দেখবেন সময় অফুরন্ত। জীবন আনন্দময়। নামায তখন বার্ডেন মনে হয় না। 


নামায ওয়াক্তমত অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে। নামাযের টাইম রেইঞ্জ আছে। সেটি হাতে-কলমে শেখানোর জন্য রাসুলুল্লাহ সা. একদিন ওয়াক্তের শুরুতে ও পরেরদিন ওয়াক্তের শেষে নামায আদায় করেন। হানাফি মাজহাব অনুসারে আমরা একদম শেষে না হলেও একটু দেরিতে নামায আদায় করি। সেক্ষেত্রে সালাফিরা স্মার্ট। এগিয়ে। তারা এশা ব্যতীত অন্যসব নামায একদম আর্লি পড়ে ফেলে। 


এখনকার হানাফি শিডিউলে ফজর নামায পড়ে বের হতে হতে অলমোস্ট সকাল হয়ে যায়। আল্লাহর রাসুল ইউজুয়ালি এমন সময়ে ফজর পড়তেন যে বের হয়ে অন্ধকারে মানুষ চেনা যেত না। যোহর ও আসর পড়া হয় ওয়াক্ত শুরুর কমপক্ষে দেড়ঘন্টা পর। আসর-মাগরিব এর মধ্যে অল্পসময় থাকাতে না পড়া যায়, না টিউশনি করা যায়, না অন্যকোন কাজ করা যায়। মাগরিব-এশার মাঝেও দেড়ঘন্টা সময় কোন কাজের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই সকল নামাযই যদি ওয়াক্ত শুরুর আধাঘণ্টার মধ্যেই পড়ে ফেলা যায় এটি হবে অনেক বরকতের এবং লজিক্যাল। সাউন্ড মাইন্ড ও হেলথের জন্যও।


যারা বাসা থেকে মিনিমাম ১-১.৩০ ঘন্টা দূরত্বে কাজ করেন, বিশেষ করে ঢাকা শহরে তাদের আসর-মাগরিব কোনটা না কোনটা গাড়িতে না জ্যামে চলে যাওয়ার আশংকা থাকে। যাদের দিন ঘুম থেকে উঠে ১০-১১টায় শুরু হয় তাদের রাতের কাজ শেষ হতে হতে রাত ১২-১টা বেজে যায়। অথচ দিনের সময়টাকে সঠিকভাবে ম্যানেজ করলে সর্বোচ্চ ডে লাইট সোর্স ব্যবহার করলে আমাদের রাতের ওয়ার্কিং আওয়ার কমে যাবে। ইলেকট্রিসিটির লোড কমে যাবে। 


দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন ও ডিজিটালাইজেশন হওয়ার কারণে নন কমিউনিকেবল ডিজিজ বার্ডেন বাড়ছে। যেমন- ডায়াবেটিস,  উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হার্টের অসুখ, স্থুলতা ইত্যাদি। এগুলো প্রতিরোধের একমাত্র উপায় লাইফস্টাইল চেইঞ্জ করা।  অর্থাৎ নিয়ম করে খাও, কাজ কর, ঘুমাও, বিশ্রাম নাও। এজন্য সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা, দিনের সময়টাকে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা জরুরি। আউয়াল ওয়াক্তে নামায সেক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি এই অসুখগুলোকে প্রতিরোধে করতে পারলে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যয় কমবে। সাশ্রয় হবে।। 


খেয়াল করুন- ১২-১২.৩০ এর মধ্যে যোহর পড়া মানে ১২-১টা সকল অফিসে লাঞ্চ ব্রেক হবে। এরপর ৪ টা পর্যন্ত অফিস হলে অন্তত ৩ ঘন্টা মানুষ সেবা পাবে। ৪ টায় অফিসে বা কর্মস্থলের পাশেই আসর পড়ে যে যার বাড়ির রাস্তা মাপবে। গ্রীষ্মকালে প্রায় ৭ টায় বেলা ডোবে। মানে অফিস শেষে আরও ৩ ঘন্টা। চাইলে ঢাকার এমাথা থেকে ওমাথা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ পৌছে যাওয়া যাবে। বাজার করা, টিউশনি করা। অনেক কিছু করা যাবে। বাসায় গিয়ে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া যাবে। আবার দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে পরদিন সকাল আটটায় অফিস ধরার রসদও পাওয়া যাবে।

No comments

Theme images by A330Pilot. Powered by Blogger.